ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নতুন রূপ ধারণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন নতুন সিদ্ধান্তের পাশাপাশি যেকোনো মন্তব্য ঘিরে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া মিলছে পুঁজিবাজারের ওঠানামায়। এই যেমন ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্যের বড় ধস দেখেছে ওয়াল স্ট্রিট। তার রেশ কিছুটা এশিয়ার বাজারেও পরিলক্ষিত হয়েছে। খবর এফটি ও রয়টার্স।
মার্কিন পুঁজিবাজারে গত সোমবার লেনদেন শুরুর কিছুক্ষণ পরই নিজ মালিকাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জেরোম পাওয়েলকে ‘মিস্টার টু লেট’ অভিহিত করে পোস্ট দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তিনি জানান, মার্কিন অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এখনই সুদহার কমানো উচিত।
এ পোস্টের নগদ প্রভাব হিসেবে পুঁজিবাজারে শেয়ার ও ডলার বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। সোমবার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের লেনদেন শেষ হয় ২ দশমিক ৪ শতাংশ পতনের মধ্য দিয়ে। এ সূচকে ৯০ শতাংশের বেশি কোম্পানির শেয়ারদর কমে যায়। অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক ২ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পায়।
হোয়াইট হাউজে প্রবেশের আগে থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন ফেড চেয়ারম্যান। এ বিরোধের উৎস সুদহার। জেরোম পাওয়েল জানিয়েছেন, কখনো রাজনৈতিক চাপের মুখে নীতি-নির্ধারণে পিছু হটবেন না। গত বৃহস্পতিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, জেরোম পাওয়েলকে বরখাস্ত করার এখতিয়ার রয়েছে তার। পরদিনই মার্কিন ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের পরিচালক কেভিন হ্যাসেট জানান, ফেড চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি মনে করেন ফেডের নীতিমালা নিয়ে ট্রাম্পের হতাশা অগ্রহণযোগ্য, তাহলে আপনাকে ব্যাখ্যা দিতে হবে।’
তবে মঙ্গলবার মার্কিন পুঁজিবাজারে লেনদেনে শুরুতে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী ভাব পরিলক্ষিত হয়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার দশমিক ৩ শতাংশ ও নাসডাক ফিউচার দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে জাপানের নিক্কেই সূচক দশমিক ২ শতাংশ কমলেও এমএসসিআই এশিয়া-প্যাসিফিক সূচক স্থিতিশীল ছিল। চীনের সিএসআই৩০০ সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর কারণ হলো আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনবিরুদ্ধ কোনো বাণিজ্য চুক্তি না করতে দেশগুলোকে সতর্ক করেছে বেইজিং। এছাড়া বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, মার্কিন বাজার থেকে তহবিল সরিয়ে অনেকে এশিয়ায় বিনিয়োগ করছেন।
এছাড়া ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে সীমিত পতন দেখা গেছে। ইউরো স্টক্স ৫০ ও ড্যাক্স ফিউচার দশমিক ৫ শতাংশ ও এফটিএসই ফিউচার দশমিক ১ শতাংশ পতন দেখেছে।
সোমবার ট্রাম্পের মন্তব্যের পর প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যায়। এ পতনের হার সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এ সময় ইউরো ১ দশমিক ১ শতাংশ শক্তিশালী হয়ে ১ ইউরোর বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছিল ১ ডলার ১৫৪ সেন্ট। দশমিক ৯ শতাংশ শক্তিশালী হওয়ায় ১ ডলারের বিপরীতে ১৪০ দশমিক ৮৪ ইয়েন পাওয়া যাচ্ছিল। এছাড়া ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে ৪ দশমিক ৪১ শতাংশে পৌঁছায়। পাশাপাশি স্বর্ণের দাম বাড়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ।
আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পিপারস্টোনের গবেষণা বিশ্লেষক কোয়াসার এলিজুন্ডিয়া বলেন, ‘ডলারের ওপর আস্থার মূল ভিত্তি ফেডের স্বাধীনতা। ডলার এখন আর আপৎকালীন আশ্রয় হিসেবে আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়, এটি এখন সক্রিয়ভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।’
জেরোম পাওয়েল বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের সূত্র ধরে গ্রে ভ্যালু ম্যানেজমেন্টে প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা স্টিভেন গ্রের ভাষ্য, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত পাওয়েল। তিনি যদি পদচ্যুত হন, তাহলে বাজারে প্রকৃত আতঙ্ক তৈরি হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নীতিনির্ধারণে অস্থিরতা বাড়ছে। ট্রাম্পের আচরণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাতে বাধ্য করছে বলে ধারণা স্টিভেন গ্রের। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়া থেকেই অনেক বিদেশী ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আগের মতো আস্থা রাখা যাবে না।’
নোমুরা সিকিউরিটিজের ফরেক্স বিশ্লেষক ইউজিরো গোটোর মতে, বন্ড বিক্রি ও ডলারের পতন একসঙ্গে হওয়া খুবই বিরল একটি ঘটনা। বিশেষ করে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি হওয়ায় বিষয়টি সতর্ক হওয়ার মতোই।
মার্কিন সরকারের অন্য ইউনিটগুলোর তুলনায় স্বতন্ত্রভাবে নীতিনির্ধারণ করে ফেডারেল রিজার্ভ। আগামী বছরের মে পর্যন্ত ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে পাওয়েলের মেয়াদ রয়েছে। তাকে বরখাস্তের চেষ্টা বা ফেডের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করলে বাজার আরো অস্থির হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালে ফেড তিনবার সুদের হার কমালেও চলতি বছরে এখনো সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে আগামী মাসে। ধারণা করা হচ্ছে, ফেড হয়তো এখন আরো সতর্ক হয়ে সুদহার কমাতে চাইবে না। কারণ রাজনৈতিক চাপের কাছে হার মানার ইঙ্গিত পেলে আর্থিক বাজারে বড় ধরনের পতন ঘটতে পারে।
চীনের বিনিয়োগ ব্যাংক সিআইসিসি এক প্রতিবেদনে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ডলার ও ট্রেজারি বন্ড এখন ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের মতো আচরণ করছে। ট্রাম্পের পাওয়েলবিরোধী মন্তব্য এ উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে।
এদিকে জেপি মরগানের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল ফেরোলি বলেন, ‘ফেডের স্বাধীনতা যদি ক্ষুণ্ণ হয়, তবে এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মার্কিন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরো বাড়বে।’